দৈনিক নয়াদিগন্ত


জীবন ও কর্ম

রূপকথার নায়ক

এ অঞ্চলের লোকসাহিত্য ও সংস্কৃতি লিপিবদ্ধ করতে ব্যাপক তৎপরতা শুরু করেছিলেন ড. দীনেশ চন্দ্র সেন, ড. মুহম্মদ শহীদুল্লাহ ও কবি মনসুরুদ্দিনের মতো সর্বসৃজনশীল ব্যক্তিরা। পরবর্তী সময়ে সেই ধারা নিরন্তর গতিশীল রাখতে কাজ করেছেন যারা; ড. আশরাফ সিদ্দিকী তাদেরই একজন।

দিবসযামী

মাদার মাদার বলে নার্সকে ডাকলেন, ‘এখানে নাশতা দাও। পত্রিকার লোক। তোমার খালুর কাছে এসেছে।’ নাশতা চলে এলো। তারপর বাইরে থেকে হঠা’ই উঁকি মারল কিশোরী এক মেয়ে ‘দাদু কী করো? খেয়েছ? তাড়াতাড়ি গোসল করে নিয়ো। মেয়েটি কাজ করে এ বাসায়। এদের নিয়েই তার সংসার। এখানে থেকেই ওরা বড় হয়, আবার এখান থেকেই ওদের বিয়ে দেয়া হয়। মজার ব্যাপার হলো, বিয়ের পর স্বামী-সংসার নিয়েও তারা এখানেই থেকে যায়। এ নিয়েই তার দিবসযামী।

রূপকথার নায়ক

সে অনেক দিন আগের কথা। মায়ের কোলে বসে গল্প শুনত ছেলেটি। রূপকথার গল্প। শুয়ো রাজা-দুয়ো রাজার গল্প। মা সমীরণ নেসার কোল থেকেই তার রূপকথার রাজ্যে প্রবেশ। সাহিত্যের পোকা তখনই মাথার ভেতর গেঁথে যায়। নিজেকে তখন রূপকথার রাজকুমারই মনে হতে থাকল। সেই ঘোর থেকেই ছোটবেলার আশরাফ বড় হয়ে হলেন ড. আশরাফ সিদ্দিকী। ১৯৯১ সালে তিনি লিখতে পেরেছিলেন ‘বাংলাদেশের রূপকথা’।
বাবা-মায়ের কাছ থেকে পেলেন রূপকথার পরশপাথর। তো সাহিত্যের দিকে ঝুঁকলেন কিভাবে? ‘মামাতো ভাই আবু সাঈদ চৌধুরীর উৎসাহে কিশোর বয়সেই সাহিত্যের দিকে ঝুঁকে পড়েছিলাম।’ আর তিনি প্রথম লিখতে শুরু করেন ক্লাস সিক্সে পড়ার সময় থেকে। তখন লিখেছিলেন ‘নববর্ষা’ শিরোনামে একটি কবিতা। এটি লেখার পেছনে উসাহ জুগিয়েছিলেন তার পাঠশালার শিক্ষক কবি আজিজ রহমান সিদ্দিকী ‘সবাই তাকে চাঁদ মিয়া বলেই ডাকত। তিনি প্রকৃতি বিষয়ক নানা কবিতা স্পষ্ট হস্তাক্ষরে লিখে স্কুলের দরজা-জানালায় এঁটে রাখতেন। আমাদেরও প্রচুর কবিতা শোনাতেন ও কবিতা লিখতে বলতেন। স্যারের উসাহও আমাকে প্রথম কবিতা লিখতে সাহস দিয়েছিল। পরবর্তীকালে রবীন্দ্রনাথ, নজরুলের কবিতাই আমাকে বেশিমাত্রায় আকৃষ্ট করেছে। তারাই আমার প্রিয় কবি। তাদের গান শুনতে ভালো লাগে।’ স্মৃতি হাতড়ে বলে গেলেন আশরাফ সিদ্দিকী।

চাকুরী জীবন

তার জন্ম ১৯২৭ সালের ১ মার্চ টাঙ্গাইলের নাগবাড়ি গ্রামে। অর্থাৎ তার নানাবাড়িতে। নানা এবাদত উদ্দিন চৌধুরী ও দাদা সলিম উদ্দিন সিদ্দিকী ছিলেন সম্ভ্রান্ত মুসলিম পরিবারের লোক। তবে দাদা ছিলেন কিছুটা বিবাগী দরবেশ ধরনের। তিনি পীরের মুরিদ ছিলেন। তার দাদীর নাম আফসন নিসা। তিনি ছিলেন সংসারী ও ধর্মপ্রাণ। আশরাফ সিদ্দিকীর বাবা ডা: আবদুস সাত্তার সিদ্দিকী ছিলেন মেধাবী ছাত্র। পাঠশালায় ছাত্রবৃত্তি পান। দশম শ্রেণীতে পড়াকালীন স্বরাজ আন্দোলনে যোগ দেন। পরবর্তীকালে ডাক্তারি পাস করে চিকিৎসক হিসেবে খ্যাতি অর্জন করেছিলেন। বাবা প্রায় ৫০ বছর ইউনিয়ন পঞ্চায়েত, ইউনিয়ন বোর্ডের চেয়ারম্যানের দায়িত্ব পালন করেন। তিনি তার আপন চাচাতো বোন সমীরণ নেসাকে বিয়ে করেছিলেন। সমীরণ নেসার বাবার নাম ছিল এবাদত উদ্দিন চৌধুরী। তিনি ছিলেন জমিদার। সমীরণ নেসা ছিলেন বাংলাদেশের সাবেক রাষ্ট্রপতি মরহুম আবু সাঈদ চৌধুরীর ফুফু ও সাবেক স্পিকার মরহুম আবদুল হামিদ চৌধুরীর বোন। তিনি ছিলেন অনেক প্রতিভাময়ী। অনেক ছড়া, প্রবাদ ও বিয়ের গীত মুখস্থ ছিল তার মা সমীরণ নেসার। পাশাপাশি ছিলেন একজন আদর্শ গৃহিণীও।

পারিবারিক ঐতিহ্য

ড. আশরাফ সিদ্দিকী লেখা ও সম্পাদনায় এ যাবত প্রকাশিত হয়েছে ৭৫টি গ্রন্থ। ১৯৫০ সালে প্রকাশিত হয় কবির কালজয়ী প্রথম কাব্যগ্রন্থ “তালেব মাস্টার ও অন্যান্য কবিতা”। ২৮টি কবিতা নিয়ে রচিত এই কাব্যগ্রন্থের দ্বিতীয় সংস্করণ প্রকাশিত হয় ১৯৬৩ সালে। ১৯৫৫ সালে প্রকাশ পায় তাঁর আরও দুটি কবিতার বই “বিষকন্যা” ও “সাত ভাই চম্পা “। ১৯৫৮ সালে কবি প্রকাশ করেন “উত্তর আকাশের তারা”। ১৯৭৬ এ প্রকাশ পায় “কুঁচ বরণ কন্যে”। স্ত্রীর মৃত্যুর পর পর লেখা কবিতাগুলো প্রকাশিত হয় ১৯৯৭ সালে নাম “সহস্র মুখের ভীড়ে”। লোকসাহিত্য বিষয়ে গবেষণা ধর্মী গ্রন্থ “লোকসাহিত্য” প্রকাশিত হয় ১৯৬৩ সালে। পরবর্তীতে একের পর এক প্রকাশ করে যান, আবহমান বাংলার লোককথা। “কিংবদন্তীর বাংলা”, “লোকায়ত বাংলা”, “আবহমান বাংলা”, “শুভ নববর্ষ”, “Folkloric Bangladesh”, “Bengali Riddles”, “Our Folklore Our Heritage”, “Tales from Bangladesh”, “Bengali Folklore” বইগুলো সেগুলোর মাঝে অন্যতম। বাংলার কিংবদন্তি এবং লোককাহিনী নিয়ে ড. সিদ্দিকী’র উপস্থাপনায় ৭০ এবং ৮০’র দশকে দীর্ঘ দিন ধরে ধারাবাহিকভাবে বাংলাদেশ টেলিভিশনে প্রচারিত হয় দর্শকনন্দিত লোকনাট্য “হীরামন”, “মেঠোসুর” এবং “একতারা”।

পাঠশালায়

জীবনের প্রথম পাঠ শুরু নানাবাড়ির পারিবারিক পাঠশালায়। এ পাঠশালা থেকে দুই টাকা মাসিক বৃত্তি পেয়েছিলেন তিনি। তার শিক্ষক ছিলেন কবি আজিজ রহমান সিদ্দিকী ওরফে চাঁদ মিয়া। ‘পরে রতনগঞ্জ মাইনর স্কুলে ভর্তি হয়েছিলাম। স্কুলের প্রতিষ্ঠাতা ছিলেন আমার বাবা। এ স্কুল থেকেও চার টাকা মাসিক বৃত্তি পেয়েছিলাম।’ বললেন আশরাফ সিদ্দিকী। তখন কি স্কুল পালিয়েছিলেন তিনি? ‘না, আমি কখনো স্কুল পালাইনি। স্কুল পালানোর মতো কোনো কারণই ঘটেনি। এখনকার ছেলেমেয়েরা কেন যেন স্কুল পালায়। হয়তো ওদের স্কুল ভালো লাগে না।’
এখনো কি মাঝে মধ্যে গ্রামে যান? ‘হ্যাঁ, যাই তো। তবে ছেলেমেয়েরা যেতে দিতে চায় না। কিন্তু আমার গ্রাম খুব ভালো লাগে। আমাদের গ্রামটি ছিল সবুজ, এখনো প্রায় তেমনটি আছে। খুব একটা পরিবর্তন হয়নি। গ্রামের তিন দিকেই নদনদী, যেন আদরিণী কন্যার মতো চার দিকের গ্রামগুলোকে ঘিরে রেখেছে। গ্রামের উত্তরেই কয়েক শ’ একরের বিশাল বিল তয়লা সুন্দরীর বিল। এগুলো নিয়ে ছিল অনেক কিংবদন্তিও।’ ছেলেবেলায় নিশ্চয়ই অনেক দুষ্টুমি করেছেন? ‘সেই বয়সের শিশুরা যা করে, আমরাও তা-ই করেছি। তবে কোনো মন্দ কাজে যাইনি। তাই তো এখনো ফেলে আসা কিশোরবেলায় ফিরে যেতে মন চায়। ফিরতে পারলে বেশ হতো। আর এখনকার ছেলেমেয়রা কেমন শৈশব কাটায় তা তো দেখেছ? ওদের জীবনটা কেমন যেন, ঠিক বুঝি না!’

জীবনের মোড়

পারিবারিক পাঠশালার গণ্ডি পেরিয়ে ময়মনসিংহ জেলা স্কুলের সপ্তম শ্রেণীতে ভর্তি হন। থাকতেন ব্রহ্মপুত্র নদের তীরে, মামা আবদুল হামিদ চৌধুরীর বাসায়। ১৯৪২ সালে ফরাসি ভাষায় লেটারসহ এ স্কুল থেকে ম্যাট্রিক পাস করেন এবং ১০ টাকা মহসিন বৃত্তি পান। আশরাফ সিদ্দিকীর বাবা চেয়েছিলেন, ছেলে ডাক্তার হবে। বাবার ইচ্ছানুসারে আনন্দমোহন কলেজে বিজ্ঞান বিভাগে ভর্তি হন। কয়েক মাস অসুস্থ থাকায় বিজ্ঞান বিভাগে আর পড়া হলো না। পরে বেলগাছিয়া কৃষি ও ভেটেরিনারি কলেজে ভর্তি হওয়ার পর আবারো অসুস্থ হয়ে পড়েন। এরপরই শান্তিনিকেতনে চলে যান। সেখানে বাংলায় অনার্স নিয়ে পড়াশোনা চালিয়ে যেতে থাকেন। এ থেকে তার বিভিন্ন লেখা পত্রপত্রিকায় নিয়মিত প্রকাশিত হতে থাকে। শান্তিনিকেতন থেকেই ইন্টারমিডিয়েট ও বাংলায় অনার্স করেন। পরে বাংলায় এম এ পাস করেন ১৯৫০ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে এবং আমেরিকার ইন্ডিয়ান বিশ্ববিদ্যালয় থেকে এমএ ও পিএইচডি অর্জন করেন ফোকলোর বিষয়ে। আশরাফ সিদ্দিকী বললেন, ‘নিয়তিই আমাকে সাহিত্যাঙ্গনে নিয়ে আসে তা আর বলার অপেক্ষা রাখে না। আর শান্তিনিকেতনে থাকার সময়ই কবিগুরুর সান্নিধ্য পেয়েছিলাম। আমার রবীন্দ্রনাথের শান্তি নিকেতন গ্রন্থে এ ব্যাপারে বিস্তারিত লেখা আছে।’
কর্মজীবনের শুরুতেই আশরাফ সিদ্দিকী টাঙ্গাইল কলেজের বাংলা বিভাগে অধ্যাপনা শুরু করেন। পরে ১৯৫১ সালের ১৫ জুলাই রাজশাহী সরকারি কলেজে প্রভাষক হিসেবে যোগ দেন। তিনি ছিলেন প্রখ্যাত পণ্ডিত ড. মুহম্মদ শহিদুল্লাহর স্নেহের। তারই আগ্রহে সে বছর নভেম্বর মাসে গবেষণার জন্য ডেপুটেশনে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে যোগ দেন। ‘পরবর্তীতে বাংলা উন্নয়ন বোর্ডের পরিচালক, বাংলা একাডেমীর মহাপরিচালক, বাসসের চেয়ারম্যান, জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয় কলেজের অধ্যক্ষ ও প্রেস ইনস্টিটিউটের চেয়ারম্যান হিসেবে দায়িত্ব পালন করে গেছি। কর্মজীবনে প্রবেশ করার পর বিয়ে করেছিলাম।’

ঘর-সংসার

আশরাফ সিদ্দিকী বিয়ে করেন উম্মে সাঈদা চৌধুরীকে ‘আমাদের বিয়ে হয় ২৩ ডিসেম্বর ১৯৫১ সালে। বিয়ে ঠিক করেন আমার আপন মামাতো ভাই বিচারপতি আবু সাঈদ চৌধুরী (পরে রাষ্ট্রপতি), বিশিষ্ট রাজনীতিবিদ মরহুম শামসুল হক, তার স্ত্রী অধ্যাপিকা আফিয়া খাতুন এবং আমার বাবা ডা: আবদুস সাত্তার সিদ্দিকী।’
উম্মে সাঈদা চৌধুরী (পরে সিদ্দিকী) প্রখ্যাত শিক্ষাবিদ ও সাহিত্যিক অধ্যক্ষ আবদুর রব চৌধুরীর দ্বিতীয় মেয়ে। আজিমপুর বালিকা বিদ্যালয়ের শিক্ষিকা ছিলেন ৩২ বছর ও স্কুলের প্রভাতকালীন দায়িত্বে ছিলেন। উম্মে সাঈদা সিদ্দিকীর অসংখ্য খ্যাতিমান ছাত্রীদের মধ্যে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাও একজন।
‘সাঈদাকে বধূরূপে পেয়ে আমার বাবা-মা অত্যন্ত প্রীত ছিলেন। আমার শিক্ষা বিভাগের চাকরিতে আমাকে রাজশাহী, ঢাকা, ময়মনসিংহ ও চট্টগ্রামে এবং শেষে দু’বার উচ্চশিক্ষার্থে দীর্ঘ দিন (১৯৫৮-৬০; ১৯৬৩-৬৬) আমেরিকা থাকতে হয়। তো এ সময়ে আমার স্ত্রী তার আপন দক্ষতায় সন্তান ও সংসার সামলিয়েছেন। যার কিছু প্রমাণ আমাকে পাঠানো লেখা তার চিঠিগুলো।’ নিচে সেই চিঠিটি তুলে ধরা হলো। এটি স্বামীর উদ্দেশে স্ত্রী লিখেছিলেন ১৯৫৯ সালের ১৪ এপ্রিল।
”হে প্রিয় আমার, তোমার ওখানে এত দিনে বসন্তের সমারোহ। আর আমাদের দারুণ গ্রীষ্মে গাত্রদাহ শুরু হয়েছে। গরমে আম-কাঁঠাল পাকে আর আমরা বস্তি এলাকায় বস্তাপচা হয়ে মরছি। কী যে অসহ্য তার অভিজ্ঞতা, তা তো তোমার আছেই। যা হোক তোমরা যে ৎধঃব-এ বসন্ত উৎসব শুরু করেছ, এ তো ভাবনার বিষয়! শেষে না প্রেম রোগটি বাজিয়ে বসো। চিঠির ভেতরে এত কথা তুমি লিখলে কী করে গো? কলম তোমার একবারও থমকে দাঁড়াল না? যদি কেউ দেখত তবে কেমন হতো? ছি: ছি: ছি:, একেবারে লাজলজ্জা ধুয়ে খেয়েছ। মার্কিন দেশে গিয়ে মার্কিনা ভাবধারায় প্রভাবান্বিত হয়ে উঠেছ। যা হোক চুপি চুপি একটু বলে রাখি, চিঠিটা বারবার পড়েছি আর বারবার বুকে বেজেছে সুখের মতো ব্যথা। এ অনুভূতির তুলনা নেই। তাই আবার লিখছি ‘কানে কানে শুধু বলো একবার তুমি যে আমার, ওগো তুমি যে আমার।’ চিঠিটার প্রতি ছত্রে ছত্রে ফুটে উঠেছে আমিময় তোমার রূপ। আবার বলছি, আমাকে ভাবতে দাও, অনুভব করতে দাও ‘তুমি যে আমার’। এমনি মিষ্টি কথাগুলো পড়তে ভালো লাগে আবার লজ্জায় চোখের পাতা বুজেও আসে। ‘থাহিদ্দার অস্তিতে’ বিশ্বাস করলে কিন্তু ঠকবে। তাহলে পাঁচ হাজার বছর আগেকার বুড়ি এসে তোমার ঘাড় মটকাবে। ওসব আজেবাজে চিন্তা না করে বর্তমানের সাঈদার ও তার তিনটি সন্তানের মুখ চেয়ে, ভালোমতন পড়। ভালোমতন পড়ে দেশে ফিরতে হবে তো?”
স্ত্রীর পাশাপাশি সন্তানেরাও তাদের বাবাকে চিঠি লিখত। ঢাকা থেকে ১৯৬৩ সালের ১৫ ডিসেম্বরে বাবাকে লেখা মেয়ের চিঠি
‘বাবা, আমার আদর নিয়ো। তোমার চিঠি পেয়ে খু-ব-ই খুশি হয়েছি। তোমার কথা আমার মনে হয় আর কান্না পায়। তুমি তাড়াতাড়ি চলে এসো। আমরা ভালো আছি। তুমি কেমন আছো? আমাকে তোমার ফটো পাঠিও। রিফি তোমাকে খোঁজে। চিঠি দিয়ো। ইতি আদরের রীমা।’
চিঠিগুলো দেখতে দেখতে আশরাফ সিদ্দিকী আবার বলতে লাগলেন, ‘অলি (সাঈদার আদরের নাম ‘অলি’) আমেরিকায় উচ্চশিক্ষার জন্য এবং স্কলারশিপ পেয়ে বিদেশ যেতে সে কোনোক্রমেই রাজি ছিল না। কারণ ছোট ছেলেমেয়েকে রেখে গেলে ওরা যদি ভালোভাবে মানুষ না হয়। আমি তো আগে থেকেই বিদেশে পড়ে আছি। শেষে মাকেও যদি শিশুরা কাছে না পায়, এই ভাবনা সারাক্ষণ মনজুড়ে থাকত।
কথার মাঝে থামিয়ে জানতে চাওয়া হলো, বিয়ের আগে তাকে দেখা, প্রেমট্রেম ছিল? কথা শুনে অবাক না হয়ে জানালেন, ‘হ্যাঁ, দেখেছি। বোরখা পরে মুখ ঢেকে বিশ্ববিদ্যালয়ে আসত। আমি দেখতাম, কিন্তু কখনো কথা হতো না। না, প্রেমট্রেম করিনি। এরপরই তো আমাদের বিয়ে হয়ে গেল।’
নিশ্চয়ই বিয়ের পর অনেক বকাঝকা করত? প্রশ্নটা অনেক সাহস নিয়ে করতেই প্রতিবাদের স্বরে বলে উঠলেন, ‘না, না, ও অনেক শান্ত ছিল। আমার ওপর কখনোই রেগে থাকত না। আমি রাগ করলে বলত, রাগ করছো কেন? কিন্তু সে কখনো রাগ করত না। তবে ছেলেমেয়েদের ওপর রাগ করে একটু বকাঝকা করত। যাতে ওরা মানুষ হয়।’
লেখালেখি নিয়ে তার ভাবনা কেমন ছিল? ‘সন্ধ্যার পরে বাসায় ফিরতাম। তারপরই লিখতাম। কারণ রাত ভালো লাগে বলে লেখাজোখা রাতের বেলায়ই লিখতাম। বেশি রাত জাগতে ভালো লাগে না। আবার সকালে ঘুম থেকে উঠে যাই। তো অলি (স্ত্রী) কখনো কখনো পাশে থাকত। আমার লেখার ব্যাপারে উৎসাহ দিত। খেয়াল রাখত কেউ যাতে আমাকে বিরক্ত না করে। আমি যখন লিখতাম তখন পেছনে এসে চুপ করে দাঁড়িয়ে থাকত। লেখা শেষ হলে ওকেই প্রথম পড়তে দিতাম। পড়া শেষ হলে বলত, ‘খুব ভালো হয়েছে। খুব ভালো হয়েছে। বাবারে, কত কথাই তো মনে পড়ে। মাঝে মাঝে সে হাসিঠাট্টা করত। আমার ভালো লাগত। জামাই ঠকানো হয় না? জামাই ঠকানোতে বেশ মজা হয়েছিল। টক খাওয়ানো হয়, তিতা খাওয়ানো হয়। ব্যাপারটায় বেশ মজা পেয়েছিলাম। এখন তো এসব ব্যাপার উঠেই যাচ্ছে।’
ডান দিকের দেয়ালের দিকে তাকিয়ে দীর্ঘশ্বাস ফেললেন তিনি, ‘ওই যে দেয়ালে টানানো মানুষটাকে দেখছো, যে মানুষটা আমার আগেই চলে গেল। এটা ঠিক হলো না। একজন কবিকে ফেলে চলে যাওয়া ঠিক হয়নি; কিন্তু কী করা যাবে। আমি একা রয়ে গেছি, একা হয়ে আছি। হ্যাঁ মনে পড়ে, খুব মনে পড়ে।’ আশরাফ সিদ্দিকীর স্ত্রী ৬৪ বছর বয়সে মারা যান ১৯৯৫ সালের ২৮ ডিসেম্বর।
পাঁচ ছেলেমেয়ের মধ্যে বড় ছেলে সাইদ সিদ্দিকী (ব্যবসায়ী), কন্যা নাহিদ আরেফা মির্জা শিক্ষকতা করছেন, দ্বিতীয় কন্যা তাসলিম আরেফা চৌধুরী ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের রাষ্ট্র বিজ্ঞানের প্রফেসর। কনিষ্ঠ কন্যা রিফাত সামিনাও শিক্ষকতা করছেন একটি স্কুলে। ছোট ছেলে রিয়াদ সিদ্দিকী বড় ভাইয়ের সাথে ব্যবসায় আছেন।

আপন আয়নায় দেখা

এক জীবনে আশরাফ সিদ্দিকীর অর্জনের খাতায় হিসাব না মেলানোই বুদ্ধিমানের কাজ। নতুন স্বপ্নের কথা জানতেই অকপটে বলেন, ‘না, আর কোনো স্বপ্ন নেই। তবে যে বইগুলো বের হয়নি, সেগুলো বের করা। পুরনো বইগুলোকে নতুন করে বের করা। ছেলেমেয়েরা বড় হয়েছে। ওরা পড়াশোনা শেষ করে যার যার জায়গায় ভালো আছে। এই তো। এই জীবনে আর কোনো আক্ষেপও নেই। ‘তালেব মাষ্টার� কবিতাটি আমার নিজের ভেতর প্রভাব ফেলেছে। অনেক ভাষায় কবিতাটি অনুবাদ হয়েছিল। আমার খুব প্রিয় কবিতা। ডিগ্রি ক্লাসের পাঠ্যসূচিতে ছিল কবিতাটি। সুভাষ দত্ত আমার ‘গলির ধারের ছেলেটি’ নিয়ে ‘ডুমুরের ফুল’ নামে যে সিনেমা করেছিল, সেটি আমার খুব ভালো লেগেছিল। দেশে-বিদেশে অনেক পুরস্কার পেয়েছিল সিনেমাটি। নিজেও একসময় প্রচুর সিনেমা দেখেছি। পালিয়েও খুব সিনেমা দেখতাম। মনে আছে, দেবদাস দেখেছি, অনেকবার দেখেছি, গৃহদাহও দেখেছি অনেকবার।’ অক্লান্ত পরিশ্রম করে বাংলার লোককথা, রূপকথা সংগ্রহ করেছেন আশরাফ সিদ্দিকী। কিন্তু বর্তমানে আমাদের নিজম্ব সংস্কৃতি হারাতে বসেছে। তার বদলে জায়গা নিচ্ছে অপসংস্কৃতি। এই নিয়ে কবির ভাবনা জানতে চাইলে আত্মবিশ্বাসের সাথে বলেন, ‘হ্যাঁ আমাদের লোকসাহিত্য টিকে থাকবে তো। থাকবে না কেন? তোমরা কি আমাদের বই পড়বে না, আমাদের গান শুনবে না? শুনবে তো।’

ব্যস্ততাকে দিয়ে ছুটি

ফেলে আসা দিনে একটুও অবসর পেতেন না আশরাফ সিদ্দিকী। একসময় ফাউন্ডেশনের খরচেই তিনি আমেরিকার বিভিন্ন স্থান, ইউকে, প্যারিস, জার্মানি, সুইজারল্যান্ড, তুরস্ক, ইরান প্রভৃতি দেশ সফর করেছেন। রাতের পর রাত গবেষণা ও সাহিত্যচর্চায় নিজেকে ডুবিয়ে রাখতেন। জীবনের ৮৬তম বছরে এসে সে ব্যস্ততা মিলিয়ে গেছে। তবুও একজন সৃষ্টিশীল মানুষ কখনো অলস সময় কাটান না। আশরাফ সিদ্দিকী নিজেই বলেন, �এখনো নিয়ম করে ঘুমাতে যাই। আবার আল্লাহর নাম করে ঘুম থেকে উঠি। সকাল-বিকেল বাসার ছাদে হাঁটাহাঁটি করি। কয়েকটি পত্রিকায় নিয়মিত টুকটাক লেখা দিই। কোনো অনুষ্ঠানের নিমন্ত্রণ থাকলে সেখানেও যাওয়ার চেষ্টা করি। কেউ বাসায় এলে তার সাথে আলাপ জমাতেও ভালো লাগে।’

ড. আশরাফ সিদ্দিকী

জন্ম : টাঙ্গাইল জেলায় ১৯২৭ সালের ১ মার্চ
বাবা : ডা: আবদুস সাত্তার সিদ্দিকী
মা : সমীরণ নেসা।
বিয়ে : ১৯৫১ সালের ২৩ ডিসেম্বর
স্ত্রী : উম্মে সাঈদা সিদ্দিকী
সন্তান : পাঁচ সন্তানের জনক
শিক্ষাগত যোগ্যতা : বাংলায় এমএ পাস ১৯৫০ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে। আমেরিকার ইন্ডিয়ান বিশ্ববিদ্যালয় থেকে এমএ ও পিএইচডি অর্জন করেন ফোকলোর বিষয়ে।
পেশা : বিভিন্ন কলেজে অধ্যাপনা, বাংলা উন্নয়ন বোর্ডের পরিচালক, বাংলা একাডেমীর মহাপরিচালক, বাসসের চেয়ারম্যান, জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয় কলেজের অধ্যক্ষ ও প্রেস ইনস্টিটিউটের চেয়ারম্যান ছিলেন।
প্রকাশিত গ্রন্থ : তালেব মাষ্টার ও অন্যান্য কবিতা (১৯৫০), বিষকন্যা (১৯৫৫), দাঁড়াও পথিক বর (১৯৯০), রাবেয়া আপা (১৩৬২), রবীন্দ্রনাথের শান্তি নিকেতন (১৯৭৪), লোক সাহিত্য (১৯৬৩), বাংলার মুখ (১৯৯৯), প্যারিস সুন্দরী (১৯৭৫), বাংলাদেশের রূপকথা (১৯৯১), আরশী নগর, শেষ কথা কে বলবে (১৯৮৮), গুনীন (১৯৮৯) উল্লেখযোগ্য।
পুরস্কার : একুশে পদক, শিশু সাহিত্যে বাংলা একাডেমী পুরস্কার (১৯৬৪), ইউনেস্কো পুরস্কারসহ তিনি আরো অনেক পুরস্কারে ভূষিত হয়েছিলেন।

 


আমি লোকসাহিত্যকে আধুনিক পর্যায়ে নিয়ে গেছি

দৈনিক কালের কণ্ঠ
প্রকাশ কালঃ ২ জুন, ২০১৭

প্রবীণ শিক্ষাবিদ, লেখক, গবেষক ড. আশ্রাফ সিদ্দিকী। তিনি এ দেশের অন্যতম প্রধান লোকসাহিত্যিক। লোককথা, লোকগাথা, প্রবাদ, রূপকথা ইত্যাদি ক্ষেত্রে লিখেছেন তিনি। তাঁর ফেলে আসা জীবন ও কাজের ভুবনের মুখোমুখি হয়েছেন ওমর শাহেদ। ছবি তুলেছেন কাকলী প্রধান।

আপনার জন্ম? মা-বাবা?

আমার জন্ম টাঙ্গাইলের নাগবাড়িতে ১৯২৯ সালের ১ মার্চ। বাবা আবদুস সাত্তার সিদ্দিকী চিকিৎসক ছিলেন। মা ছিলেন খুব প্রগতিমনা। বাংলাদেশের সাবেক রাষ্ট্রপতি আবু সাঈদ চৌধুরীর তিনি আপন ফুফু। তাঁর বাবা আবদুল হামিদ চৌধুরী পার্লামেন্টে বিরোধী দলে ছিলেন। একই গ্রামে তাঁদের জন্ম। আবদুল হামিদ চৌধুরী আবার আমার বাবার আপন চাচাতো ভাই। আমরা ভাই-বোন পাঁচজন। আমার বড় ভাই, বোন। তারপর আমি। এর পর ভাই, বোন আছে। তবে এখন আমিই বেঁচে আছি। বাকিরা চলে গেছেন।

বাংলা একাডেমিতে থাকতে আমারা নেত্রকোনা, জামালপুর, কিশোরগঞ্জ,কুষ্টিয়া, রাজশাহীসহ বিভিন্ন জেলায় ফোক কালেকটর বা লোক সংগ্রাহক নিযুক্ত করলাম। আমাদের ১০১ জন কালেকটর ছিলেন। লোকসাহিত্যের জন্য টাকাও বরাদ্দ ছিল। এইসব সংগ্রাহকের বেশির ভাগই স্কুল শিক্ষক ছিলেন। কেউ কেউ ছিলেন গ্রামের কবি। তাঁরা আমাদের যেসব সংগ্রহ করে দিতেন, মান যাচাইয়ের পর সেগুলোর বিনিময়ে টাকা নিতেন। শুধু বাংলা একাডেমিই নয়, ইসলামিক ফাউন্ডেশন, নজরুল একাডেমি, শিল্পকলা একাডেমিতেও তাঁরা বিভিন্ন নথি, গুরুত্বপূর্ণ নানা কিছু সংগ্রহ করে দিতেন

লোকসাহিত্যের প্রতি আগ্রহ কিভাবে হলো?

আমাদের নাগবাড়িতে সারা বছরই লোকেরা গান গাইত। ধান, পাট কাটার সময় গান করত। মাঝেমধ্যে লোকগীতি নিয়ে বিভিন্ন অনুষ্ঠান হতো। বহু দূর থেকে গায়করা আসতেন। যাঁরা গ্রামের অর্থশালী লোক, তাঁরাই তাঁদের আনতেন। বিশেষ বিশেষ অনুষ্ঠান যেমন ঈদ, দুর্গাপূজা, মহররম ইত্যাদিতে তাঁদের দাওয়াত করে আনা হতো। প্রায় সারা রাত তাঁরা গান করতেন। তাঁদের সেসব গান শুনেই আমার লোকসাহিত্যের প্রতি একটি ভালোবাসা জন্মায়। এ ছাড়া স্কুলে পড়ার সময়ও বিশেষত ময়মনসিংহ জিলা স্কুলে পড়ার সময় দেখেছি, সে অঞ্চলের নেত্রকোনা, কিশোরগঞ্জ জেলায় প্রচুর লোকসাহিত্যনির্ভর অনুষ্ঠান হতো। সেগুলো দেখে দেখে লোকসাহিত্যের প্রতি ভালোবাসা জন্ম নিল। লোকসাহিত্যে এই অঞ্চল অত্যন্ত সমৃদ্ধ। এখান থেকেই মৈমনসিংহ গীতিকা সংগৃহীত হয়, দীনেশচন্দ্র সেন সম্পাদনা করেন। দীনেশচন্দ্র, আশুতোষ ভট্টাচার্যদের বই পড়েও লোকসাহিত্যের প্রতি দৃষ্টি আকর্ষিত হয়। যখন শান্তিনিকেতনে গেলাম, অনেক কিছুর সঙ্গে শান্তিনিকেতনের সম্পর্ক ছিল। তখন লোকসাহিত্য পড়ার যথেষ্ট সুযোগ সৃষ্টি হলো, বহু লোকগবেষকের সঙ্গে পরিচিত হলাম। দীনেশচন্দ্র সেন, আশুতোষ ভট্টাচার্য, ড. মুহম্মদ শহীদুল্লাহ, সংগীতকার আব্বাসউদ্দীন আহমদসহ আরো অনেককে দেখলাম। তাঁদের দেখেও লোকসাহিত্যের প্রতি আকর্ষণ, ভালোবাসা হলো। শান্তিনিকেতনে অনেক বিখ্যাত লোকবিজ্ঞানী ছিলেন। রবীন্দ্রনাথের পরিবারের সবারই লোকসাহিত্যের প্রতি ভালোবাসা ছিল, রবীন্দ্রনাথেরও ছিল। তিনি লোকসাহিত্য, ছড়ার ওপর বই লিখেছেন। কাজেই শান্তিনিকেতন আমার বেইজ বা ভিত্তিটি তৈরি করে দেয়।

রবীন্দ্রনাথের সঙ্গে যোগাযোগ কিভাবে?

রবীন্দ্রনাথকে দেখিনি, তবে তাঁর দুটি চিঠি আমি পেয়েছি। ছোটবেলায় তাঁকে নববর্ষের শুভেচ্ছা জানিয়েছিলাম। তিনি তার জবাবে আমাকে দার্জিলিং থেকে নববর্ষের শুভেচ্ছা জানালেন। তারপর শান্তিনিকেতন চলে গেলেন। তাঁকে নিয়ে বন্ধু ও আত্মীয়দের মধ্যে আমি অনেক আলোচনা করলাম। সেই থেকে তাঁর সাহিত্যের প্রতি আমার একটি আকর্ষণ হয়। পরে তাঁকে চিঠি লিখলাম, শান্তিনিকেতনে যেতে চাই। তিনি শান্তিনিকেতনের প্রিন্সিপালকে দিয়ে চিঠির উত্তর দিলেন—‘ঠিক আছে তুমি আসো। এখানে তোমার পড়াশোনার ব্যবস্থা হবে।’ তাঁর এই চিঠির সূত্র ধরেই শান্তিনিকেতনে পড়তে গেলাম। কর্তৃপক্ষও আমাকে হাফ ফ্রি করে দিল। সেই চিঠিও আছে। আমার লেখা বই আছে ‘রবীন্দ্রনাথের শান্তিনিকেতন’, ‘শান্তিনিকেতনের পত্র’—এগুলোর মধ্যে এসব বর্ণনা আছে। সেখান থেকে এক বছর পর ইন্টারমিডিয়েট পাস করলাম। তারপর বিএ অনার্স পড়লাম। কিন্তু এরপর দেশভাগ হয়ে গেল বলে বাংলাদেশে এসে পরীক্ষা দিলাম। করটিয়া সা’দত কলেজে আমার সিট পড়েছিল। সেখান থেকে অনার্স পাস করলাম। প্রথম শ্রেণি পেলাম। এরপর ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে বাংলায় এমএ পড়লাম। সেখানেও প্রথম শ্রেণিই পেলাম। প্রথম শ্রেণিতে বোধ হয় দ্বিতীয় হয়েছিলাম। তারপর খেয়াল হলো বিদেশে পড়তে যাব, ফুলব্রাইট স্কলারশিপের জন্য দরখাস্ত করলাম এবং পেয়েও গেলাম। আমেরিকার ইন্ডিয়ানা ইউনিভার্সিটি থেকে এমএ ডিগ্রি নিয়ে চলে এলাম। সেখানেও ফোকলোর আমার বিষয় ছিল।

কলকাতায় থাকতে তো অনেকের সঙ্গে দেখা হয়েছে?

কলকাতায় থাকার সময় কবি কাজী নজরুল ইসলাম একটি অনুষ্ঠানে বক্তৃতা দিয়েছিলেন। তখনই তাঁর কথা জড়িয়ে আসছিল। কবি তখন কলকাতার শ্যামবাজারে থাকতেন। একবার কোনো এক সিনেমা হলে তিনি সিনেমা দেখতে গিয়েছিলেন। সেখানে দুই দলের ঝগড়া লাগল। তাদের লাঠির একটি বাড়ি তাঁর মাথায় এসে লাগল। ফলে তাঁর মাথার খুলি ভেঙে গেল। এরপর থেকে আস্তে আস্তে তাঁর বাক্শক্তি বন্ধ হয়ে গেল। কলকাতায় চিকিৎসা করা হলো, কিন্তু কোনো উন্নতি হলো না। তারপর তাঁকে বিলাতে পাঠানো হলো। সেখানে তিনি অনেকটা উন্নতি করলেন। ফিরে আসার পর আবার অসুবিধা হলো। তখন সরকারই তাঁকে রাঁচিতে পাঠাল। সেখানেও উন্নতি হলো না। এরপর বাংলাদেশ সরকার তাঁকে ঢাকায় নিয়ে এলো। ঢাকা মেডিক্যাল কলেজে অনেক চিকিৎসা হলো। কিন্তু ইমপ্রুভ হলো না।

বুদ্ধদেব বসু, প্রমথনাথ বিশী কলকাতা সিটি কলেজে আমার শিক্ষক ছিলেন। বুদ্ধদেব বসু ভালো পড়াতেন। তিনি আসতেন, সুন্দরভাবে পড়িয়ে চলে যেতেন। কথাবার্তা বলতেন না। প্রমথনাথ বিশী ক্লাসে খুব হাসি-ঠাট্টার মাধ্যমে কথা বলতেন। সে জন্য তিনি ছাত্রমহলে খুব জনপ্রিয় ছিলেন। এ ছাড়া অরবিন্দু বসুর সঙ্গে আমার দেখা হয়েছে। তিনি আমাদের লেখায় খুব উৎসাহ দিতেন—‘পড়ো পড়ো পড়ো, লিখতে হলে আরো পড়তে হবে। রবীন্দ্রনাথ, তারাশঙ্কর পড়ো। পড়তে পড়তে তুমি একটি পথের দিশা পেয়ে যাবে’—এসব বলতেন। আনন্দমেলার পরিচালকেরও সঙ্গে দেখা হয়েছে। ড. নিহাররঞ্জন রায় কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ছিলেন। তিনি অনার্সে আমাদের পড়াতেন। তিনি খুব ভালো পড়াতেন। প্রাচীন সাহিত্য পড়াতেন, অত্যন্ত ভালো শিক্ষক ছিলেন। এ ছাড়া দৈনিক আজাদে আবুল কালাম শামসুদ্দীন ছিলেন, তাঁর সঙ্গে বহুবার দেখা হয়েছে। সেখানে মোহাম্মদ মোদাব্বেরের সঙ্গে দেখা হয়েছে। তিনি আজাদের মুকুলের মাহফিল পরিচালনা করতেন। তাঁর বাড়ি ছিল বশিরহাট।

আপনার পিএইচডির বিষয় কী ছিল?

‘বেঙ্গলি ফোকলোর ডিউরিং ব্রিটিশ পিরিয়ড।’ দুই বছর অমানুষিক পরিশ্রম করে আমি ইন্ডিয়ানা বিশ্ববিদ্যালয়ে পিএইচডির গবেষণা করেছি। দীনেশচন্দ্র সেন লোকসাহিত্য নিয়ে বিরাট কাজ করেছেন। সে কাজকে অবলম্বন করেই আমি ওখানে কাজ করেছি। আমার কাজের পুরোটাই তাঁর গবেষণাকে কেন্দ্র করে হয়েছে। তিনি বাংলায় কাজ করেছিলেন, আমি ইংরেজিতে করেছি। তাঁর কাজকে ডেভেলপ করে আমি লোকসাহিত্যকে আধুনিক পর্যায়ে নিয়ে গেছি। আমার পিএইচডির থিসিস বিদেশ থেকে ওরা বের করেছে। এই থিসিসগুলো ওদের সম্পত্তি, তারা বই আকারে বের করে। পরে অবশ্য আমাদের বাংলা একাডেমিও এটি প্রকাশ করেছে।

শিক্ষকতায় কেন এসেছিলেন?

আমি তো শান্তিনিকেতনে পড়তাম, কাজেই পড়াতেই ভালো লাগত। সেই জীবন আমার পছন্দ ছিল। সে জন্য শিক্ষকতাকেই বেছে নিলাম। আর প্রশাসন আমার ভালো লাগেনি। মাঝখানে আমাকে প্রশাসনিক দায়িত্ব দেওয়া হয়েছিল। দুই বছর ডিস্ট্রিক্ট গেজেটিয়ারে ছিলাম। ঢাকার ইডেন বিল্ডিংয়ে অফিস ছিল, ঢাকা জেলার ইতিহাস লিখতে হতো। কিন্তু সেটি আমার ভালো লাগেনি বলে তদবির করে ঢাকা কলেজে চলে গেলাম। তখন এই কলেজে বাংলা বিভাগে চারজন শিক্ষক ছিলেন, আমি বিভাগীয় প্রধান। কলেজে ছাত্রসংখ্যা ভালোই ছিল, ১০ হাজারের কাছাকাছি। সেখানে দুই বছর থাকার পরে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় কলেজে বদলি করা হলো। সেখান থেকে বাংলা একাডেমিতে মহাপরিচালক হিসেবে বদলি হলাম।

শিক্ষকতার শুরু তো কুমুদিনী কলেজ থেকে?

সেখানে আমি ১৯৫১ সালে গেলাম। এমএ পরীক্ষা দিয়ে টাঙ্গাইল বেড়াতে গেলাম। তাঁরা বললেন, এখানে কিছুদিন পড়ান। রাজি হয়ে গেলাম। মাত্র ছয় মাসের সেই জীবনটি খুব ভালো কেটেছে। রায়বাহাদুর আরপি (রণদা প্রসাদ) সাহা মাঝেমধ্যে কলেজে আসতেন। এটি মেয়েদের কলেজ।  এরপর ফল প্রকাশিত হলো। সরকারি চাকরি শুরু করলাম। প্রথমে ময়মনসিংহের আনন্দমোহন কলেজে অধ্যাপনা করেছি। দুই বছর পর রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় কলেজে। এই কলেজটি পদ্মা নদীর ধারে। কলেজের অবস্থা ভালোই ছিল। ছাত্রও অনেক। কলেজে তেমন কোনো গণ্ডগোল ছিল না। শিক্ষকদের প্রায় সবাই উত্তরবঙ্গের মানুষ। তাঁদের লেখাপড়াও ভালো ছিল। কেউ রাজনীতি করতেন না। সরকারি কলেজে রাজনীতি করাও যায় না। সেখানে দুই বছর থাকার পর দুই বছরের জন্য ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে চলে এলাম। আমাকে ড. মুহম্মদ শহীদুল্লাহ নিয়ে এসেছিলেন। তিনি রাজশাহী কলেজে একটি সেমিনারে এসেছিলেন। তিনি বললেন, ‘এখানে থেকে কী হবে? তুমি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে চলে এসো। তোমার যে বিষয়, সেখানে গেলে ভালো হবে।’ তিনি আমাকে স্নেহ করতেন। তিনি তখন বাংলা বিভাগের প্রধান ছিলেন না। তবে ইমেরিটাস প্রফেসর ছিলেন। সেখানে এক হিন্দু ভদ্রলোক বিভাগীয় প্রধান ছিলেন। তিনিও আমাকে পছন্দ করলেন। শান্তিনিকেতনের ছাত্র বলে তিনি আমাকে নিয়ে এলেন। তখন মোয়াজ্জেম হোসেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য ছিলেন। আমাকে ডেপুটেশনে নেওয়া হলো। বিশ্ববিদ্যালয়ে নানা ধরনের সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান হতো। দেশের অবস্থা রাজনৈতিকভাবে তখন খুব উত্তপ্ত ছিল। এ অবস্থায় মনে হলো, রাজশাহীতে তো ভালোই ছিলাম। আমি তো ঢাকা বিশ্বদ্যািলয়ের চাকুরে নই, আমার সরকারি চাকরি। সেখান থেকে পিএইচডির জন্য আমেরিকায় চলে গেলাম। ফেরার পর সরকারি চাকরিতে পদোন্নতি হলো। এরপর আবার রাজশাহী কলেজে। এক বছরের মাথায় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ডেপুটেশনে চলে এলাম। দুই বছর থাকলাম। সেখান থেকে চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় কলেজ। মাত্র এক বছর ছিলাম। সেখানে এমএ পড়ানো হতো। তখন এই কলেজে ১০ হাজার ছাত্র-ছাত্রী ছিল। এরপর জগন্নাথ কলেজে বদলি করে দেওয়া হলো। সেখানেও এমএ পড়ানো হতো। ২২ হাজার ছাত্র-ছাত্রী ছিল। আমার অনেক বিখ্যাত বিখ্যাত ছাত্র আছে। তাদের মধ্যে ড. মনিরুজ্জামান, ড. আনিসুজ্জামান ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে, ড. ওয়াকিল আহমেদও আমার ছাত্র। তারা সবাই দেশ অথবা বিদেশে পিএইচডি পেয়েছে।

জগন্নাথ কলেজে তো অধ্যক্ষ ছিলেন?

হ্যাঁ, প্রিন্সিপাল হিসেবে দুই বছর ছিলাম। ওই কলেজে খুব বেশি রাজনীতি ছিল। ছাত্রদের নিয়ন্ত্রণ করা যাচ্ছিল না। ছাত্রদের মধ্যে মারামারি, কাটাকাটি হতো, অহরহ গোলাগুলি লেগেই থাকত। দুই-একটি হত্যাকাণ্ডও হলো। সে খবরও পত্রপত্রিকায় বের হয়েছিল। ফলে দেখলাম যে এখানে আর চাকরি করা যাবে না। কোনো শিক্ষকই সম্মানের সঙ্গে ক্লাস নিতে পারছেন না। এখানে থাকলে অপমানিত হতে হবে। যদি অন্য কোথাও দিত, তাহলে চাকরি করতাম। কিন্তু সরকার অন্য কোনো জায়গায় আমাকে দিল না। তারা আমাকে দুই বছর এক্সটেনশন দিতে চেয়েছিল। কিন্তু আমার ভালো লাগেনি। কাজেই  ১৯৬৬-১৯৬৮ সাল পর্যন্ত থেকে রিটায়ার করে বাড়িতে চলে এলাম, গবেষণা করতে লাগলাম।

বাংলা একাডেমির মহাপরিচালকের জীবন?

আমাকে এখানে ড. মুহম্মদ শহীদুল্লাহ নিয়ে এসেছিলেন। তিনি নিজে একজন গবেষক ছিলেন। কাজেই তিনি শুধু আমাকে নয়, যাঁরা গবেষণা করতেন, তাঁদের সবাইকেই আদর করতেন। আমার পরে ড. আনিসুজ্জামান, ড. রফিকুল ইসলামদের তিনি স্নেহ করে কাজ করার সুযোগ করে দিয়েছেন। বাংলা একাডেমিতে মহাপরিচালক হিসেবে যোগদানের পর ফোকলোর বিভাগকে বিস্তৃত করতে শুরু করলাম। আগে এটি তেমন কোনো অবস্থায় ছিল না। বিভিন্ন অঞ্চল থেকে লোক সংগ্রাহক নিযুক্ত করলাম। লোকসাহিত্য সংগ্রহের জন্য টাকা বরাদ্দ করা হলো। আগে এখানে ফোকলোরের চর্চা কম ছিল। আমি চেষ্টা করতে লাগলাম, ধীরে ধীরে ফোকলোর বিভাগ খুবই সমৃদ্ধ হতে লাগল। একাডেমি থেকে অনেক বই বেরোলো। আমার নিজেরই অনেকগুলো বই প্রকাশিত হলো। আগে এখানে ফোকলোরের চর্চা ছিল ১০ শতাংশ, আমি গিয়ে শতভাগ করলাম। বাংলা একাডেমিতে আমি ১৯৬০ থেকে ৬৬ সাল পর্যন্ত ছিলাম। এখানে দলাদলি একটু কম ছিল। এটি ভালো বিষয় ছিল।

লেখালেখির শুরু কিভাবে হলো?

তখন আমি যুক্তরাষ্ট্রের ইন্ডিয়ানা ইউনিভার্সিটির ছাত্র। সেখানে দেখলাম ছাত্ররা অনেকেই বই লেখে। ফলে একটি বই লেখা যায় কি না আমিও ভাবলাম। বাংলার লোককথানির্ভর ‘ভোম্বল দাস দ্য আংকেল অব লায়ন’ নামের একটি পাণ্ডুলিপি লিখে নিউ ইয়র্কের বিখ্যাত ম্যাকমিলান কম্পানিকে পাঠালাম। তারা সেটি ছাপতে রাজি হলো। তখন আমার ৫২ বছর, মধ্য বয়স। ‘সিংহের মামা ভোম্বল দাস’ ১১টি ভাষায় প্রকাশিত হয়েছে। এরপর আমার আরো একটি বই তারা ছাপতে রাজি হলো—‘টুনটুনি অ্যান্ড আদার টেলস।’ এটিও সংগ্রহ করা লোককাহিনি। এ দুটি বইয়ের লোককথাগুলো বাংলাদেশের বিভিন্ন অঞ্চল, বিশেষ করে ময়মনসিংহ থেকে সংগ্রহ করা হয়েছিল। সেখানে স্কুল-কলেজে এ বই দুটি পাঠ্য হলো। বই দুটি প্রকাশের পর আমার বেশ লাভ হলো। দেশে বেশ নাম হয়ে গেল। 

শিশুদের নিয়ে লেখার কথা মাথায় কেন এলো?

ছোটবেলায় আমরা আজাদ পত্রিকার শিশুদের আসর মুকুলের মাহফিল করতাম। সেখানে মোদাব্বের সাহেব ছিলেন। আবুল কালাম শামসুদ্দীন, হাবিবুর রহমানসহ আরো অনেক লেখক সেখানে শিশুদের জন্য লিখতেন। তাঁরা আমাদের লিখতে বলতেন, উৎসাহ দিতেন। তাঁরা মাঝেমধ্যে সভা ডাকতেন, সেগুলোতে শিশুসাহিত্য নিয়ে আলোচনা করতেন। এরপর তো ঢাকায় চলে এলাম। ইত্তেফাক, আজাদ, ইত্তেহাদ ঢাকা থেকে প্রকাশিত হতে লাগল। এসব পত্রিকায়ও শিশুদের পাতা ছিল। সেখানে আমরা লিখতাম। মাঝেমধ্যে সাহিত্যসভা হতো, আমরা যেতাম। এভাবেই তাদের নিয়ে লেখার শুরু।

আপনার আরো অনেক বই আছে।

আমার লোকসাহিত্যের ওপর ১২ খণ্ডের বই আছে। সেটির একেক খণ্ডে একেকটি বিষয় নিয়ে কাজ করেছি। একটিতে লোকগান, অন্যটিতে লোকগীতিকা, কোনোটিতে প্রবাদ, কোনোটিতে ধাঁধা—এভাবে খণ্ডগুলো সাজিয়েছি। এসব বিষয় নিয়ে পত্রপত্রিকায় লেখা ছাপা হতো, সেগুলো আমার কাছে ছিল। বাংলা একাডেমির পত্রিকায়ও অনেক কিছু পেয়েছিলাম। নিজেরও কিছু কালেকশন ছিল। সব মিলিয়ে প্রাচীন ও বর্তমান বই থেকে সংগ্রহ করে বইগুলো লিখেছি। আমার আরেকটি বই ‘কিংবদন্তির বাংলায়’ ঢাকা, চট্টগ্রাম, রাজশাহী, বরিশাল ইত্যাদি অঞ্চল নিয়ে যেসব কিংবদন্তি, মুখে মুখে প্রচলিত কথা আছে, সেগুলো তুলে ধরেছি। যেমন ঢাকা নামটি কেন হলো? ঢাক্কা মানে ঢাকায় ঢোল বাজানো হতো বলে এর নাম ঢাকা হয়েছে। টঙ্গো-আইল নামটি থেকে টাঙ্গাইল নাম হয়েছে। এসব লোককথা বিভিন্ন জায়গায় চলিত ছিল, কিন্তু আমার আগে সংগ্রহ করা হয়নি। ‘শুভ নববর্ষ’ বইটি আমার ভালো লাগে। এতে বাংলাদেশের ঐতিহ্যগুলো সম্পর্কে বলা হয়েছে। আর ‘বাংলাদেশের লোকগীতিকা’ বইটি আট খণ্ডের। দীনেশচন্দ্র সেনের সংগ্রহকে কেন্দ্র করে, নতুন আরো কিছু সংগ্রহ নিয়ে এই বইটি তৈরি করেছি। ‘আবহমান বাংলা’ এবং ‘বাংলার মুখ’ও সেই ধরনের লেখা নিয়ে তৈরি করেছি। আমাদের বিভিন্ন অঞ্চলে যেসব লোকসাহিত্য, লোকগীতি, লোককথা, লোকগাথা লুকায়িত আছে, সেগুলো নিয়ে এ বইটি লেখা। ‘প্যারিস সুন্দরী’ আমার রম্যরচনা। ‘লোকায়ত বাংলা’ লোকসাহিত্যগুলো আমাদের এখানে যেভাবে প্রচলিত আছে, সেটি নিয়ে লেখা। যেমন একটি গান কিভাবে, কখন, কোন অঞ্চলে গাওয়া হয়, সত্যিকারভাবে মাঠেঘাটে এগুলো কী অবস্থায় আছে, সেসব নিয়ে লেখা। লোকসাহিত্যের ওপর আমার প্রায় ৩০টি বই আছে। বাকিগুলো অন্যান্য বিষয়ে লেখা।

কিভাবে সংগ্রহ করতেন?

কোনো এলাকায় ভালো কিছু আছে জানার পর সাধারণত ছাত্রদের দিয়ে সংগ্রহ করাতাম। আবার নিজেও সংগ্রহ করতাম। এভাবেই নেত্রকোনা, কিশোরগঞ্জের লোকসাহিত্যগুলো সংগ্রহ করেছি। আর বাংলা একাডেমিতে থাকতে আমরা নেত্রকোনা, জামালপুর, কিশোরগঞ্জ, কুষ্টিয়া, রাজশাহীসহ বিভিন্ন জেলায় ফোক কালেকটর বা লোক সংগ্রাহক নিযুক্ত করলাম। আমাদের ১০১ জন কালেকটর ছিলেন। লোকসাহিত্যের জন্য টাকাও বরাদ্দ ছিল। এসব সংগ্রাহকের বেশির ভাগই স্কুল শিক্ষক ছিলেন। কেউ কেউ ছিলেন গ্রামের কবি। সিলেটের একজন গ্রাম্য কবি আলী আকবর চৌধুরী অনেক লোকসাহিত্য আমাদের সংগ্রহ করে দিয়েছেন। তাঁরা আমাদের যেসব সংগ্রহ করে দিতেন, মান যাচাইয়ের পর সেগুলোর বিনিময়ে টাকা নিতেন। শুধু বাংলা একাডেমিই নয়, ইসলামিক ফাউন্ডেশন, নজরুল একাডেমি, শিল্পকলা একাডেমিতেও তাঁরা বিভিন্ন নথি, গুরুত্বপূর্ণ নানা কিছু সংগ্রহ করে দিতেন। একটি লোকগীতির জন্য ১০ টাকা, লোকগীতিকাপ্রতি ২৫ টাকা, লোককথার জন্য ১৫ টাকা দেওয়া হতো। কোন ধরনের সংগ্রহের জন্য কেমন টাকা দেওয়া হবে সেটি আমাদের মিটিংয়ে ঠিক করা হতো। এভাবেই চট্টগ্রাম, মৈমনসিংহ গীতিকার অনেক লোকগীতিকা সংগ্রহ করা হয়েছে। তবে সবচেয়ে বেশি লোকসাহিত্য সংগ্রহ করেছিলেন আশুতোষ ভট্টাচার্য। তিনি পরে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ও কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক হয়েছিলেন। তিনি পূর্ববঙ্গ গীতিকা, মৈমনসিংহ গীতিকার ওপর চমৎকার কাজ করেছেন। আমাদের মতো বিদেশে না গেলেও তিনি দেশে থেকেই চমৎকার সুনাম কুড়িয়েছিলেন।

লোকসাহিত্যকে রেডিও-টিভিতে নানা অনুষ্ঠানের মাধ্যমে ছড়িয়ে দিয়েছেন।         

বিটিভি থেকে আমাকে লোকসাহিত্যের ওপর অনুষ্ঠান করতে বলা হলো। বললাম কী করব? বলল, লোকগীতি ও লোকগীতিকার ওপরেই আপাতত কাজ করেন। পরে কী করা যায় দেখা যাবে। কাজেই ‘হীরামন’ নামের একটি অনুষ্ঠান তৈরি করতে লাগলাম। তারা সে অনুষ্ঠান প্রায় এক বছর প্রচার করেছিল। অনুষ্ঠানটি খুবই জনপ্রিয় হয়েছিল বলে মনে হয়। অসংখ্য চিঠি আসত। অনুষ্ঠানটি তারা বারবার দেখতে চাইত বলে হীরামন কয়েকবার রিপিটও করা হয়েছিল।

আপনার একটি বিখ্যাত কবিতা আছে ‘তালেব মাস্টার’।

দেশভাগের পর করটিয়া সা’দত কলেজে পড়ার সময় কবিতাটি লিখেছিলাম। নতুন সাহিত্য নামের একটি সাহিত্যপত্রে কবিতাটি প্রকাশিত হলো, খুব প্রশংসিত হলো। নানা সংকলনেও কবিতাটি প্রকাশিত হয়েছে। (এই বলে তিনি কবিতাটি আবৃত্তি করতে লাগলেন)—‘তাল সোনাপুরের তালেব মাস্টার আমিঃ/আজ থেকে আরম্ভ করে ৪০ বছর দিবসযামী/যদিও করছি লেন নয় শিক্ষার দেন (মাফ করবেন। নাম শুনেই চিনবেন)।’ এই কবিতাটি ম্যাট্রিকে র্যাপিড রিডারে পড়ানো হতো। আমার লেখা গল্প ‘গলির ধারের ছেলেটি’ও ম্যাট্রিকে র্যাপিড রিডারে পাঠ্য ছিল। তারপর আমাদের বিখ্যাত চিত্রাভিনেতা সুভাষ দত্ত গল্পটিকে ‘ডুমুরের ফুল’ নামের ছবি আকারে বের করলেন। সেটিও দেশে-বিদেশে খুব প্রশংসিত হলো। আমিও দেখেছি। তবে নামটি আমার পছন্দ হয়নি। তাঁকে বললাম, ডুমুরের ফুল কেউ বোঝে না, ছবির নাম গলির ধারে ছেলেটি রাখলেই ভালো হতো। তখন বললেন, পরে ঠিক করে দেব। কিন্তু আর করেননি।

আপনার ছেলে-মেয়ে?

পাঁচজন। বড় ছেলে বিখ্যাত গার্মেন্ট ফ্যাক্টরি ক্যাটস আইয়ের মালিক, ছোট ছেলে তার অংশীদার। মেয়েরা বিশ্ববিদ্যালয়ে ও কলেজে আছে। আমার মেয়ে তাসনিম সিদ্দিকী ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের রাষ্ট্রবিজ্ঞানের অধ্যাপক।

তরুণদের জন্য কোনো উপদেশ?

বারবার চেষ্টা করতে হবে, বেশি করে লিখতে হবে। প্রাচীন ও বর্তমানে যাঁরা লিখছেন তাঁদের বই, দেশ-বিদেশের সাহিত্য পড়তে হবে।


সাক্ষাৎকার
নববর্ষে ইলিশ না খেয়ে বারো রকম ভর্তা খাওয়া যেতে পারে : ড. আশরাফ সিদ্দিকী

দৈনিক যুগান্তর । প্রকাশ : ১৩ এপ্রিল, ২০১৬ 

ড. আশরাফ সিদ্দিকীর জন্ম ১৯২৭ সালে টাঙ্গাইল জেলায়। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বাংলায় এমএ ডিগ্রি অর্জনের পর মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ইন্ডিয়ানা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ফোকলোর বিষয়ে এমএ ও পিএইচডি করেন। কর্মজীবনে তিনি বিভিন্ন কলেজে অধ্যাপনা, কেন্দ্রীয় বাংলা উন্নয়ন বোর্ডের পরিচালক, বাংলা একাডেমির মহাপরিচালক, বাসসের চেয়ারম্যান ও প্রেস ইন্সটিটিউটের চেয়ারম্যানের দায়িত্ব পালন করেন। ড. সিদ্দিকীর প্রকাশিত গ্রন্থের সংখ্যা ৭৫। ১৯৫০ সালে প্রকাশিত হয় তার কালজয়ী প্রথম কাব্যগ্রন্থ ‘তালেব মাস্টার ও অন্যান্য কবিতা’। এ অঞ্চলের লোকসাহিত্য ও সংস্কৃতি লিপিবদ্ধ করতে যে কর্মকাণ্ড শুরু করেছিলেন ড. দীনেশচন্দ্র সেন, ড. মুহম্মদ শহীদুল্লাহ ও কবি মনসুরুদ্দিনের মতো সর্বসৃজনশীল ব্যক্তিরা, পরবর্তী সময়ে সেই ধারা নিরন্তর গতিশীল রাখতে যারা কাজ করেছেন- ড. আশরাফ সিদ্দিকী তাদেরই একজন। যুগান্তরের সঙ্গে একান্ত সাক্ষাৎকারে ড. সিদ্দিকী বাংলা নববর্ষ উদযাপন, আবহমান বাংলার লোকসংস্কৃতি ও ঐতিহ্যের স্বরূপ বিশ্লেষণসহ অন্যান্য বিষয়ে খোলামেলা কথা বলেছেন। সাক্ষাৎকার নিয়েছেন

যুগান্তর : বাংলা নববর্ষ উদযাপনে পান্তা-ইলিশ কি অপরিহার্য?

আশরাফ সিদ্দিকী : না, অপরিহার্য নয়। পান্তা-ইলিশের ধারণাটা হঠাৎ করেই আমাদের নববর্ষ উদযাপনের সঙ্গে যুক্ত হয়েছে। মূলত এটি ছিল একটি নাগরিক উদ্যোগ। এর পেছনে ব্যবসায়িক অভিসন্ধিও থাকতে পারে। পান্তা-ইলিশ উৎসব এখন ক্ষতিকর বলে বিবেচিত হচ্ছে। এ অবস্থায় যদি এটি পরিহার করা জরুরি বলে মনে হয়, তাহলে অনায়াসে বাদ দেয়া যেতে পারে। আমার মনে হয়, নববর্ষে পান্তা-ইলিশ না খেয়ে পান্তার সঙ্গে বারো রকম ভর্তা খাওয়া যেতে পারে।

যুগান্তর : মানুষ যদি মাছের বিকল্প হিসেবে ভর্তা গ্রহণ না করে?

আ. সি. : সেক্ষেত্রে আরও তো অনেক মাছ আছে বাংলাদেশে। প্রাপ্যতা অনুযায়ী অন্যান্য মাছ দিয়েও আমরা উৎসব করতে পারি। ইলিশের বদলে কৈ, মাগুর ইত্যাদি নেয়া যেতে পারে। আজকেও পত্রিকায় এসেছে- পহেলা বৈশাখ সামনে রেখে প্রচুর জাটকা নিধন করা হচ্ছে। এটি আত্মঘাতী প্রবণতা। আর কিছুদিন পরেই এসব জাটকা পূর্ণতা পেত। মনে রাখা দরকার, পূর্ণতাপ্রাপ্ত একটা মা ইলিশ লাখ লাখ ইলিশের উৎস। কাজেই এ সময়টায় তাদের জীবন রথ থামিয়ে দেয়া কিছুতেই উচিত হবে না।

যুগান্তর : আপনার কি মনে হয় না, খাবারটাই উৎসবের প্রধান অনুষঙ্গ নয়?

আ. সি. : খাওয়া অবশ্য চলবে। এটা থেকে মানুষকে বিরত রাখা যাবে না।

যুগান্তর : খাওয়া চলুক, সময়ের প্রয়োজনে খাবারের উপাদানে পরিবর্তন আনলে ক্ষতি কী?

আ. সি. : তা আনা যেতে পারে। এজন্য দরকার দূরদর্শিতার পরিচয় দেয়া। ভবিষ্যৎ ক্ষতির দিকটি আত্মস্থ করা।

যুগান্তর : এক সময় তো নববর্ষ উদযাপনে ঢেকিছাঁটা মোটা চাল দিয়ে পান্তা করা হতো। সেই পান্তার সঙ্গে থাকত পেঁয়াজ-মরিচ কিংবা আলু ভর্তা। ইলিশটা কোত্থেকে উড়ে এসে জুড়ে বসল?

আ. সি. : হ্যাঁ। আগে এরকমটাই প্রচলিত ছিল। সে সময় নববর্ষ সামনে রেখে গ্রামের মহিলারা চৈত্রসংক্রান্তিতে এক ধরনের লোকাচার পালন করতেন, যার নাম ছিল আমানি। ইলিশ এসেছে হঠাৎ ফুলেফেঁপে ওঠা শহুরে মধ্যবিত্ত শ্রেণীর পৃষ্ঠপোষকতায়। পরে হুজুগে বাঙালি এটাকে নববর্ষ উৎসবের অবিচ্ছেদ্য অনুষঙ্গ করে ফেলেছে।

যুগান্তর : পান্তা-ইলিশের ডামাডোলে দেশের ইলিশ সম্পদের যে ভয়াবহ ক্ষতি হচ্ছে, এ দিকটি সম্পর্কে মানুষকে সচেতন করা জরুরি নয় কি?

আ. সি. : হ্যাঁ, জরুরি। অবশ্য এরই মধ্যে দেশের রেডিও-টেলিভিশনে, সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে পহেলা বৈশাখকে উপলক্ষ করে ইলিশ নিধনের বিপক্ষে জনমত তৈরির প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে। আশা করা যায়, এতে ফল পাওয়া যাবে।

যুগান্তর : পহেলা বৈশাখ বা বাংলা নববর্ষ উৎসবের বিবর্তন সম্পকে বলুন।

আ. সি. : বাংলা নববর্ষ আবহমান বাংলার উৎসব। আগে নববর্ষ বা পহেলা বৈশাখে সাধারণত হালখাতা হতো। হিন্দু-মুসলমান জমিদার যারা ছিলেন তাদের বাড়িতে হালখাতা হতো। আর গ্রামে হতো মেলা। বাংলাদেশের অন্তত ৫৭০টির মতো জায়গায় মেলা হতো। এসব মেলায় গ্রামীণ হস্তশিল্প, কাপড়-চোপড়, কামার-কুমোরের তৈরি জিনিসপত্র, স্বর্ণকারদের তৈরি নানারকম স্বর্ণ ও রূপার অলংকার ছাড়াও বিভিন্ন জিনিসপত্র বিক্রি হতো। মানুষ এসব কিনত, কিনে আনন্দ পেত। আর হতো গান। বারোমাসি গান হতো এসব মেলায়। সকাল থেকে আরম্ভ করে রাত পর্যন্ত। কোনো কোনো জায়গায় থিয়েটার হতো। লাঠি খেলাও হতো। আবার কোনো কোনো মেলায় ঘোড়দৌড়ও হতো। এসব অনুষ্ঠান পল্লীর মানুষকে আনন্দ দিত। উজ্জীবিত করত।

যুগান্তর : ঘোড়দৌড় তো এখন প্রায় হারিয়েই গেছে।

আ. সি. : হ্যাঁ। আগে এটা খুব হতো। এখন ঘোড়া নেই। ঘোড়দৌড়ও খুব একটা চোখে পড়ে না। ঘোড়দৌড়ের সঙ্গে কোথাও কোথাও সাইকেল রেসও হতো। আমাদের গ্রামীণ মেলার এই যে ঐতিহাসিক দিক, এটাকে অবলম্বন করেই অগ্রসর হওয়া উচিত।

যুগান্তর : নববর্ষ উৎসবের নগরকেন্দ্রিক যে ধারা তৈরি হয়েছে- এটাকে আপনি কীভাবে দেখছেন?

আ. সি. : আবহমানকাল থেকে বাংলাদেশে বাংলা নববর্ষের উৎসব পালিত হচ্ছে। এক সময় এ উৎসব গ্রামীণ পটভূমিতে উদযাপিত হলেও এখন নগরজীবনে এটা ব্যাপকভাবে বিস্তৃত ও প্রসারিত হয়েছে। ইদানীং এ উৎসবে কিছু অস্বাস্থ্যকর জিনিস যুক্ত হয়েছে। উৎসবে এখন বাজে গান, বাজে নাচ ইত্যাদি দেখা যায়। অবশ্য এগুলো সংখ্যায় যে খুব বেশি, তা নয়। তবুও আমাদের সাবধান হতে হবে। সাবধান থাকতে হবে। উৎসব পালনে, আচার-আচরণে আমরা যেন এমন কিছু না করি, যাতে আমাদের হাজার বছরের লালিত ঐতিহ্য ও সংস্কৃতির গায়ে কালি লাগে।

যুগান্তর : লোকজ মেলার আদি ও অকৃত্রিম যে রূপ- নগরায়ন ও বিশ্বায়নের প্রভাবে তা কি ম্লান হচ্ছে?

আ. সি. : এটা ঠিক, আমাদের লোকসংস্কৃতির ঐতিহ্য- যা আগে গ্রামে-গ্রামে চৈত্রসংক্রান্তির মেলায়, বৈশাখী মেলায় ফুটে উঠত, সেটার ঔজ্জ্বল্য আস্তে আস্তে কমে আসছে। এখন শহরেই শহুরে আমেজে বৈশাখী মেলা, চৈত্রসংক্রান্তি মেলা অনুষ্ঠিত হচ্ছে। কারণ শহরের মানুষের টাকা-পয়সা আছে। শহরে বা কোনো কোনো অঞ্চলে বেশ জাঁকজমকের সঙ্গে মেলাগুলো হচ্ছে। ধরুন, এই ঢাকা শহরেই ঢাকেশ্বরী মন্দিরে, বাংলা একাডেমি ও শিল্পকলা একাডেমি প্রাঙ্গণে মেলা হচ্ছে। এসব মেলায় হরেক রকম জিনিস পাওয়া যায়। ক্রেতা সমাগমও হয় প্রচুর। এসব মেলায় নানারকম লোকশিল্প ঐতিহ্যের দেখা পাওয়া গেলেও নগরায়ন, বিশ্বায়নের চাপে তা কিছুটা নষ্ট হচ্ছে। কিন্তু নষ্ট হলেও একেবারে মরে যায়নি। শেষ হয়ে যায়নি। পার্থক্য এটুকুই- আগে গ্রামকেন্দ্রিক স্বতঃস্ফূর্ত-স্বাভাবিক যে মেলা ছিল, উৎসব ছিল- সেটা এখন গ্রাম থেকে শহরে চলে এসেছে।

যুগান্তর : বাংলাদেশে লোকসংস্কৃতির যে বিশাল ভাণ্ডার রয়েছে, আধুনিকতার ধাক্কায় তা নষ্ট হয়ে যাবে কি?

আ. সি. : নষ্ট হবে বলে মনে করি না। তবে আগে এর যে আবেদন, ঐতিহ্য, আনন্দ ও ঔজ্জ্বল্য ছিল- সেটাকে বাঁচিয়ে রাখা কঠিন হয়ে পড়েছে। সবই নগরায়নের বৃত্তের মধ্যে পড়ে যাচ্ছে। হাজার বছরের ঐতিহ্যমণ্ডিত সেই দোলন, রথযাত্রা, মেলা ইত্যাদি এখন উঠে যাচ্ছে। শহরে এখন এগুলো নতুনভাবে, নতুন আঙ্গিকে আত্মপ্রকাশ করছে। এর সঙ্গে আমাদের প্রাচীন ঐতিহ্য, রীতি-নীতি ও উৎসবের খুব একটা মিল নেই। এ হল শহুরে মেলা। তবুও এসব মেলায় লোকজন যায়। বিভিন্ন জিনিসপত্র কিনে। মেলায় খাবার-দাবারের ব্যবস্থা থাকে, গান-বাজনার ব্যবস্থা থাকে। তবে তা আধুনিক গান। এ যুগের গান। কোথাও আবার নাচেরও আয়োজন থাকে। সেখানে সবাই মিলে নাচে। আনন্দ করে। ফুর্তি করে। এ থেকে একটা জিনিস তো পরিষ্কার- আমাদের উৎসবের প্রাচীন ঐতিহ্য, রীতি-নীতি নষ্ট না হলেও এর রূপ অনেকটাই পাল্টে গেছে।

যুগান্তর : প্রথা ও ঐতিহ্যের নামে কুসংস্কার লালন করা উচিত কি?

আ. সি. : না। কিছুতেই উচিত নয়। অতীতে সমাজে, মানুষের মনে যেসব কুংস্কার প্রকট আকারে বিদ্যমান ছিল, তা এখন অনেকটাই কমে এসেছে। এটা মূলত শিক্ষার প্রসারের জন্যই হয়েছে। মানুষ যত শিক্ষিত হবে, সচেতন হবে, বিজ্ঞানমনস্ক হবে- আস্তে আস্তে এটা আরও কমে যাবে। এজন্য তেমন চিন্তিত হওয়ার কোনো কারণ নেই। যা ভালো, যা সত্য-সুন্দর-শাশ্বত, মানুষ সেটাই গ্রহণ করবে।

যুগান্তর : এক্ষেত্রে আমাদের গ্রামীণ সংস্কৃতি উদ্দীপকের কাজ করবে?

আ. সি. : উত্তরাধিকার সূত্রে পাওয়া গ্রামীণ ঐতিহ্য ও সংস্কৃতি আমাদের মূল ভিত্তি। এটার ওপর ভিত্তি করেই আমাদের নতুন নতুন সাংস্কৃতিক চর্চা করতে হবে। নতুন নতুন সিনেমার গান, নতুন নতুন যাত্রা-থিয়েটারের চর্চা করতে হবে। আমি মনে করি, এ ধারা অনুসরণ করে অগ্রসর হলে আধুনিক যুগের মানুষ এগুলো গ্রহণ করবে। তাদের ভালো লাগবে।

যুগান্তর : প্রাচীন লোকজ সংস্কৃতিকে আধুনিক সংস্কৃতি থেকে আলাদা রাখা উচিত- নাকি দুটোর মধ্যে সমন্বয় করে পথ চলাই শ্রেয়?

আ. সি. : আমার মনে হয়, দুটোর মধ্যে সমন্বয় করে পথ চলাই উত্তম। অতীত সংস্কৃতি, ঐতিহ্যকে যদি আমরা অবজ্ঞা করি, তাহলে নিজেকেই অবজ্ঞা করা হয়। আমার বাবা-মা, দাদা-দাদিকে অবজ্ঞা করা হয়।

যুগান্তর : ঐতিহ্যের নামে আধুনিকতাকে বর্জন করাও তো ঠিক হবে না!

আ. সি. : না, সেটাও ঠিক হবে না। আধুনিকতা ও যুগের চাহিদার সঙ্গে সমন্বয় করেই আমাদের পথ চলতে হবে। অগ্রসর হতে হবে।

যুগান্তর : লোকজ সংস্কৃতির বিকৃতি রোধ করতে হলে কী ধরনের পদক্ষেপ নেয়া প্রয়োজন?

আ. সি. : আমাদের হাজার বছরের যে লোকজ সংস্কৃতি, তার সবকিছু এ যুগে পালন করা সম্ভব নয়। বর্তমান যুগের আধুনিক যে ভাবধারা আছে, সেই ভাবধারা থাকবে। আবার প্রাচীন যে ঐতিহ্য- সেটাও থাকবে।

যুগান্তর : এ ব্যাপারে সরকার কী পদক্ষেপ নিতে পারে?

আ. সি. : আমার মনে হয়, আমাদের প্রাচীন উৎসব-অনুষ্ঠান যেগুলো ছিল, সরকার তা নতুনভাবে গ্রামীণ জনপদে চালু করার উদ্যোগ নিতে পারে। এগুলো শুধু শহরে সীমাবদ্ধ রাখলেই চলবে না। গ্রামেও পুনরায় তার চর্চা শুরু করতে হবে। এ ব্যাপারে দেশের স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠান, বিশেষ করে ইউনিয়ন পরিষদকে কাজে লাগানো যেতে পারে। ইউনিয়ন পরিষদকে সরকার বলতে পারে- বাংলাদেশের হাজার বছরের ঐতিহ্য চৈত্রসংক্রান্তি মেলা, বৈশাখী মেলা ইত্যাদি আগে তোমাদের অঞ্চলে যেভাবে হতো, এখন আবার সেভাবে করার চেষ্টা করো। যেসব এলাকায় মেলা হচ্ছে না, সেখানে মেলার আয়োজন করো।

যুগান্তর : কিন্তু মেলার নামে জুয়া, অশ্লীল নাচ-গান ইত্যাদির চর্চা শুরু হলে কী করব আমরা?

আ. সি. : এগুলো রোধ করার ব্যাপারে কঠোর মনোভাব গ্রহণ করতে হবে। একদিনে হয়তো রোধ করা যাবে না। আস্তে আস্তে করতে হবে। প্রশাসনের সহায়তায় এটা করা সম্ভব। আস্তে আস্তে এগুলো বন্ধ হয়ে গেলে মানুষ নতুন সংস্কৃতিকে গ্রহণ করবে। রেডিও-টেলিভিশন-সিনেমা এখন গ্রামগঞ্জে, বাড়িতে-বাড়িতে পৌঁছে গেছে। এসব গণমাধ্যম কাজে লাগিয়ে মানুষকে বোঝানো সম্ভব, আত্মস্থ করানো সম্ভব।

যুগান্তর : আকাশ সংস্কৃতির আগ্রাসন চলছে এখন, এ অবস্থায় মানুষ কি আমাদের রেডিও-টেলিভিশনের কথা শুনবে?

আ. সি. : এটা সত্য- আকাশ সংস্কৃতির দাপট আমাদের ভাবনার বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে। তবুও চেষ্টা করতে হবে, যাতে আকাশ সংস্কৃতি সবকিছু গ্রাস করতে না পারে। আমাদের পত্র-পত্রিকা, রেডিও-টেলিভিশনে আকাশ-সংস্কৃতির ক্ষতিকর ও নেতিবাচক দিকগুলো সম্পর্কে সমালোচনা করতে হবে। এটা পুরোপুরি হয়তো বন্ধ করা যাবে না। তবে উদ্যোগ নিলে ৮০ ভাগ নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব।

যুগান্তর : এক সময় বাংলাদেশ টেলিভিশনে আপনার লোককাহিনীনির্ভর হীরামন, মেঠোসুর ইত্যাদি অনুষ্ঠান ব্যাপক জনপ্রিয়তা পেয়েছিল। এসব অনুষ্ঠান পুনরায় নতুন আঙ্গিকে উপস্থাপন করা যায়?

আ. সি. : আগে একটা টেলিভিশন চ্যানেল ছিল। এখন তো অনেক চ্যানেল হয়েছে। আমার মনে হয়- সব ক’টি চ্যানেলে না হলেও কিছু কিছু চ্যানেলে এগুলো আবার শুরু করা যায়।

যুগান্তর : গ্রাম ও শহরের সংস্কৃতিকে এক সুতোয় বাঁধার জন্য আপনি প্রচুর কাজ করেছেন। কতটা সফল হয়েছেন?

আ. সি. : আমি কাজ করেছি, তবে পুরোপুরি সফল হয়েছি- এ কথা বলা যাবে না। দেখা যাচ্ছে, শহুরে সংস্কৃতি গ্রামীণ সংস্কৃতির ধারক-বাহক ও পৃষ্ঠপোষক না হয়ে তার ঘাড়ে চেপে বসতে চাইছে। যারা নগরায়ণের সঙ্গে যুক্ত, যারা নগর নিয়ে চিন্তাভাবনা করেন, তাদের উচিত গ্রামীণ সংস্কৃতিকে শহুরে জীবনের সঙ্গে সম্পৃক্ত করার উদ্যোগ নেয়া। এটাকে জনপ্রিয় করার চেষ্টা করা। এরপরও মানুষ যদি এটাকে গ্রহণ না করে তাহলে তো সেটা বিলুপ্ত হবেই। আর গ্রহণ করলে এটা টিকে থাকবে যুগের পর যুগ, শতাব্দীর পর শতাব্দী। আমি মনে করি, মানুষ এটাকে গ্রহণ করবে।

যুগান্তর : আধুনিকতা আমাদের জীবন পরিপূর্ণ করছে, নাকি আমাদের জীবনের ছন্দ-মাধুর্য কেড়ে নিচ্ছে?

আ. সি. : আধুনিকতা মানুষের জীবনকে সহজ করে সত্য, তবে এর পাশাপাশি নানা জটিলতারও উদ্ভব ঘটায়। চলার পথে আধুনিক মানুষকে প্রতিনিয়ত এসব জটিলতার মুখোমুখি দাঁড়াতে হয়। বাস্তবতার কষাঘাতে জর্জরিত তার জীবন। অনেকটা যান্ত্রিকতানির্ভর। এ জীবনে মন-মননশীলতার চর্চা করার সুযোগ খুবই কম। এ অর্থে এ জীবনকে ছন্দ-মাধুর্যহীন জীবন বলা যেতে পারে। তবে সারা পৃথিবী উন্নয়নের পালে হাওয়া লাগিয়ে যে গতিতে অগ্রসর হচ্ছে, আমরা চাইলেও তা থেকে বিচ্ছিন্ন থাকতে পারব না। থাকা উচিতও হবে না। আবার আবহমান কালের যে বাংলাদেশ, তাকেও আমরা কিছুতেই অস্বীকার করতে পারি না। বাংলার নদী, বাংলার পথ, বাংলার গান, বাংলার উৎসব-অনুষ্ঠান- আধুনিকতার নামে এগুলোকে অবহেলা না করে, অবজ্ঞা না করে যদি আমরা এর ভেতরকার সুর-ছন্দ-মাধুর্য আহরণে মনোযোগী হই- তাহলে আমাদের জীবনও ছন্দ-মাধুর্যে পরিপূর্ণ হয়ে উঠবে।

যুগান্তর : আমাদের বিলুপ্তপ্রায় প্রাচীন উৎসব-অনুষ্ঠানগুলো পুনরুজ্জীবিত করার মধ্য দিয়েই সমাধান খুঁজতে হবে?

আ. সি. : হ্যাঁ, পুনরুজ্জীবিত করা দরকার। চর্চা করা দরকার। সংরক্ষণ করা দরকার। ইউনিয়ন কাউন্সিলের মাধ্যমে আমাদের প্রাচীন উৎসব-অনুষ্ঠানগুলো আবার পুনরুজ্জীবিত করার পদক্ষেপ নেয়া দরকার। পুনরুজ্জীবিত করলে গ্রামে গ্রামে কৃষ্টি-সংস্কৃতির চর্চা বৃদ্ধি পাবে। তখন এর ঢেউ এসে শহরেও লাগবে। যুগান্তর : শহর যদি এটা গ্রহণ না করে?

আ. সি. : এ ক্ষেত্রে আমি বলব, আধুনিকতার দরকার আছে। অধুনা থাকলে আধুনিকতাও থাকবে। কিন্তু আধুনিকতার নামে আমরা আমাদের বাপ-দাদা, নানা-নানিকে, গৌরবময় সমৃদ্ধ লোকায়ত ঐতিহ্যকে যেন ভুলে না যাই, অবহেলা না করি।

যুগান্তর : গ্রামও তো আর আগের গ্রাম নেই। রাস্তাঘাট হয়েছে। বিদ্যুৎ গেছে। তথ্যপ্রযুক্তির ছোঁয়াও লেগেছে প্রায় প্রতিটি গ্রামে এবং মানুষ এসবে অভ্যস্ত হওয়ার চেষ্টা করছে...

আ. সি. : সংস্কৃতি একদিনে সমৃদ্ধ হয় না। এটা হাজার বছর ধরে গড়ে ওঠে। আমাদের হাজার বছরের সংস্কৃতির জন্ম-বিকাশ গ্রামকে কেন্দ্র করেই হয়েছে। এখন এ সম্পদ তাকে ফিরিয়ে দেয়ার জন্য যা যা করা দরকার, করতে হবে। আমি আগেও বলেছি, এ কাজটা আমাদের ইউনিয়ন পরিষদের মাধ্যমে করা যেতে পারে।

যুগান্তর : প্রযুক্তির কল্যাণে এখন তো সবকিছুর বিন্যাস, সংরক্ষণ এবং তা দেশে-বিদেশে ছড়িয়ে দেয়ার সুযোগ তৈরি হয়েছে। এ প্রক্রিয়ায় আমাদের প্রাচীন লোকজসংস্কৃতি ইন্টারনেটের মাধ্যমে ছড়িয়ে দিলে কেমন হবে?

আ. সি. : এটা খুবই ভালো হবে এবং এটা করা উচিত। সুন্দরভাবে সবকিছু বিন্যাস করে ছোট ছোট নাটক, সিনেমা, গান ইত্যাদির মাধ্যমে আমরা আমাদের সম্পদ-ঐশ্বর্য দেশে-বিদেশে সবার সামনে উপস্থাপন করতে পারি।

যুগান্তর : দেশের তরুণ সমাজের জন্য আপনার কী সুপারিশ থাকবে?

আ. সি. : তরুণ সমাজের কাছে আমার সুপারিশ থাকবে, আমাদের হাজার বছরের ঐতিহ্যকে আমরা যেন ভুলে না যাই। অবজ্ঞা না করি। এগুলোকে ধারণ করেই তারা যেন নতুন জীবনের পথে অগ্রসর হয়।

যুগান্তর : আপনাকে ধন্যবাদ।

আ. সি. : অসংখ্য ধন্যবাদ।